08 September, 2010

মা, খুব বড় একটা ভুল করেছিলে তুমি…

.................................................

হ্যা, ঠিকই বলছি, খুব বড় একটা ভুল করেছিলে তুমি আমাদের ছোটবেলায়; আমাদেরকে ঈদের উলটাপালটা সংজ্ঞা শিখিয়ে। এখন দেখো এই বড়বেলায়, কিছুতেই আর ঈদকে মেলাতে পারিনা তোমার কাছ থেকে শেখা ঈদের সাথে। প্রতিনিয়তঃ তাই ভেংগেচুড়ে তছনছ হই। রাগ-দুঃখ আর হতাশায় ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে চিৎকার করে বলি তোমরা অমন অসাধারণ না হয় একটু সাধারণ পিতা-মাতাই না হয় হতে! তোমরা ছোটবেলায় অমনভাবে বড় করেছিলে বলেই না এখন আর কোনোকিছুর সাথেই খাপ খাওয়াতে পারিনা। খাপ খাওয়াতে পারিনা ঈদের নামে এই কেনা-কাটা কালচারের সাথে। খাপ খাওয়াতে পারিনা ঈদের নামে এই ভোগবাদী সমাজের বানিজ্যিকরণের সাথে। খাপ খাওয়াতে পারিনা ঈদের নামে সমাজের একটা বিশাল সংখ্যক জনগনের বিত্ত-বৈভবের চরম প্রদর্শনীর সাথে।

ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিলো ঈদের আগেরদিন রাতে তোমার রাত জেগে সেলাই মেশিন নিয়ে যুদ্ধ। তোমার সব কাজ সেরে আমাদের ঈদের জামা সেলাই করার জন্য এই একটা রাতই থাকতো তোমার হাতে। বিশাল গজ কাপড় কিনে নিয়ে আসতে তুমি। একই কাপড় দিয়ে সবার জন্য ঈদের ড্রেস! বড়ভাইয়ার শার্ট, আমার, কাজের মেয়ের আর ফুপাতো বোনের জামা সব একই কাপড় দিয়ে!! আর সেটাই ছিলো আমাদের কাছে ঈদের আনন্দ। সবাই একই কাপড় পড়েছি! এখন অবাক হয়ে ভাবি, তখন কোনোদিন ভুলেও রাগ করিনি কাজের মেয়ের আর আমার জামার কাপড় একইরকম কেনো ভেবে! কোনোদিন ভুলেও চিন্তা করিনি বড়ভাইয়ার শার্ট আর আমার জামার কাপড় একই বলে মানুষ হাসতে পারে! আচ্ছা আমরা নাহয় ছোট ছিলাম, বুঝিনি, কিন্তু তুমি কীভাবে পারতে নিজের সন্তান আর কাজের মানুষদেরকে এরকম একই কাপড়ে ঈদের ড্রেস সিলিয়ে দিতে? কোনোদিন তোমাকে দেখিনি ঈদের জন্য নতুন শাড়ি বা কিছু কিনতে। কিন্তু তোমার মুখে তাই নিয়ে কখনো আফসোস করতেও শুনিনি!

এখনতো সেজন্যেই কোনোকিছুর সাথেই কিছু মিলাতে পারিনা মা। কাজের মানুষ আর সন্তান একই কাপড় পড়বে সেতো অনেক অনেক দূরের কথা, কোনো নতুন কাপড় ছাড়া ঘরের গৃহিনী হাসিমুখে ঈদ করবে সেওতো অনেক দূরের কথা মা; এখন যে চারিদিকে খালি প্রতিযোগীতা! তুমি কল্পনা করতে পারবেনা মা মানুষ এখন ঈদের নামে কেমন পাগলের মত কেনাকাটা করে। সেই কেনাকাটা আবার দেখিয়ে বেড়ায়। অবাক হয়ে অন্যদের কথোপকথন শুনি, “কেনাকাটা শেষ?”… “কেনাকাটা কী আর শেষ হয়? ছেলের জন্য শার্ট প্যান্ট কিনেছি, কিন্তু একটা পাঞ্জাবী দেখে আসলাম, ঈদের আগেরদিনের জন্য অপেক্ষা করছি, এত্ত দাম! আগেরদিন দাম কমাতে পারে।”… “উফ, মানুষটা এমন কিপটা হয়ে যাচ্ছে দিন দিন, অনেক কষ্টে দু’টো শাড়ির টাকা বের করে নিয়েছি। অবশ্য গতমাসেই যে ব্যাগদু’টো কিনেছিলাম সেগুলো খুব দামী ছিলো, তাই এত কম শাড়ি নিয়েছি”!... “সেকি ভাবী, আপনি অমুক দোকানে যাননি, সেখানে তো অমুক জায়গা থেকে অমুক ড্রেস এসেছে!”… “আমার মেয়েটা গতবছর ওর মামা-চাচা সবার কাছ থেকে সহ মোট ছয়টা ড্রেস পেয়েছিলো। এবার একটা কম হয়েছে তাই তার মন খারাপ। কী আর করবো, শেষে নিজেই আরেকটা কিনে দিলাম”! .........ছেলেরাও কম যায়না মা! "আড়ং এর নাকি লুবনান এর পাঞ্জাবী?" "শার্ট নিলি, ফতুয়াটাও নিলে পারতি!" "তোর এই জুতার স্টাইল দুইবছরের পুরানো!" "এইবার ঈদে কিন্তু পার্সোনা থেকে চুলের নতুন স্টাইল দিমু" "ক্রোকোডাইল থেকে নাকি কেটস আই থেকে নিলি?" ব্র্যান্ডের পোষাক, ব্র্যান্ডেড দোকানে চুল কাটানো, ব্র্যান্ডেড জুতার এইসব রকমারী আহামরি দেখলে তোমার শিউর দমবন্ধ হয়ে আসবে...

খুব কমন কিছু কথোপকথন। এসব শুনতে শুনতে অবাক হয়ে ভাবি, মানুষ বলে আমাদের দেশটা নাকি গরীব! কিন্তু প্রায় প্রতিটা গেদারিং-এ এইসব আলোচনা আর মার্কেটে মানুষ পিষে মারার মত ভীড় দেখে আমার কাছে তো উলটা মনে হয়। মনে হয় আমাদের দেশের মানুষদেরকে টাকায় কামড়ায়, তাই যে যত পারে তত কেনে, আর যত কেনে তত দেখিয়ে বেড়ায়!... ভাবি আর শুনি। শুনতেই থাকি। আর ইচ্ছে হয় বধির হয়ে যাই। মানুষগুলোকে আমার কাছে এখন ড্রাকুলার মত লাগে। মনে হয় যেনো সবার হাঁ করা মুখ দিয়ে বিশাল এক জিব বেরিয়েছে, সেই জিব দিয়ে চারপাশে যা পাবে তাই চেটেপুটে খাবে। সেদিন এক বাসায় গিয়ে দেখি বি-শা-ল এক চারপাল্লার আলমারির পুরোটাই তার শাড়ির সংগ্রহ; তারপরও আফসোস অমুক শাড়িটা দামে মিলেনি তাই কিনতে পারেননি! আমার চোখ জ্বলতে থাকে, মাথা ব্যাথা করতে থাকে, উঠে চলে যাই। আমার সাথে তাই কারোরই মিলেনা মা। আর তখনই ইচ্ছে হয় তোমাকে ধরে ঝাঁকাই আর জিজ্ঞেস করি, আমাদেরকে এভাবে বড় করলে কেনো?? কেনো আমরা অন্যভাবে ভাবি? অন্যভাবে ভাবার যে ভীষণ কষ্ট মা। বড় একলা লাগে। সবার এমন খাই খাই’র মাঝখানে নিজেকে অচেনা মনে হয়। মনে হয় যেনো আমি মানুষ না। মনে হয় যেনো ভিনগ্রহের কেউ, ভুলে এই সমাজে চলে এসেছি, যেখানে কিছুর সাথেই খাপ খাওয়াতে পারছিনা।

শুধু কী ঈদ? মনে পড়ে বাসায় আমাদের ডায়নিং টেবিল ছিলোনা। ড্রাইভার থেকে শুরু করে, গরীব মানুষ, বড়লোক মানুষ যে-ই আসুক, বাবা সবাইকে নিয়ে পাটিতে বসে খেতো। কোনোদিন তাই বুঝিনি অনেকের সাথে একসাথে খেতে বসাটা শোভনীয় না। আর এই না বুঝার জন্য কত যে অনাকাংখিত পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয়েছে!... বড় খাট-টাতে দাদু থাকতো। কিন্তু দাদুর মাথায় অনেক উকুন ছিলো তাই আমরা কেউ-ই দাদুর সাথে খাটে শুতে চাইতাম না। শেষে সবাই মিলে নীচে পাটিতে ঘুমাতাম। কাজের মেয়ে, বাসার আশ্রিতা, আমরা ভাইবোন সবাই পাশাপাশি ঘুমিয়েছি। এই করে করেই তুমি আমাদের মাথাটা নষ্ট করেছো। বিপ্লবী না হয়েও তুমি যে নিরব বিপ্লব ঘটিয়েছিলে আমাদের ছোটবেলায়, সেই বিপ্লবের জেড় টানতে গিয়ে এখন বার বার বিপর্যস্ত হই। অসামাজিক হয়ে যাই। ঘরের বাইরে বের হয়ে তাই প্রতিনিয়তঃ হোঁচট খেতে হয়েছে সে প্রথম থেকেই। এখনো হোঁচট খেয়েই যাচ্ছি…

কতবার ভেবেছি ছোটবেলার এইসব সময়, এইসব শিক্ষাগুলোকে ব্লিচিং করে ধুয়ে মুছে দিবো মাথা থেকে; কতবার ভেবেছি আমিও শাড়ি-গয়না নিয়ে ভাববো, কতবার ভেবেছি আমিও আর দশটা মানুষের মত হয়ে যাবো; কিন্তু কেনো যে পারিনা। পারিনা বলেই শুনতে হয় “সবাই তোমার মত না। এমন হলে তো সমাজে চলতে পারবেনা”। আমি তখন অবাক হয়ে ভাবি, তুমি আর বাবা তোমরা কীভাবে পারতে? তোমরা কীভাবে এইসব কুৎসিত প্রতিযোগীতার সার্কেলের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলে সারাটা জীবন ধরে? কোথা থেকে পেয়েছিলে অমন মানসিক শক্তি সন্তান আর কাজের মানুষকে ঈদের দিন একই কাপড় পড়াতে? কেমন করে পেরেছিলে নিজে নতুন কোনো কাপড় না নিয়েও হাসিমুখে ঈদ পার করে দিতে? উলটো কতবার দেখেছি ঈদ শেষে দাদু বাড়ি থেকে ফিরে আসার সময় বোরকা পড়ে ভিতরের শাড়িটা পর্যন্ত খুলে দিয়ে এসেছো কোনো গরীব মহিলাকে। আর সেটাই ছিলো আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক ঘটনা।

ক্লাস এইটের বৃত্তির টাকা দিয়ে কত শখ করে তোমাকে সোনালী পাড়ের কালো শাড়িটা কিনে দিয়েছিলাম। আমার কিনে আনা শাড়িটা হাতে নিয়ে তোমার মুখের হাসি দেখেই বুঝেছিলাম খুব পছন্দ হয়েছে তোমার। শাড়িটা পড়ার পর তোমাকে এত সুন্দর লাগছিলো!! কিন্তু ঐ মহিলা যখন বললো ‘শাড়িটা খুব সুন্দর’; তুমি তখনই খুলে দিয়ে দিলে! খুব দুঃখ পেয়েছিলাম আমি। চিৎকার করেছিলাম। রাগারাগী করেছিলাম; নিজের সব দিয়ে দাও ভাল কথা, তাই বলে আমার স্কলারশিপের টাকায় কিনে আনা শাড়িও দিয়ে দিবা?? তুমি বার বার বলছিলে, এতে বেশী ছোয়াব হবে, তোর পড়ালেখায় দেখবি আরো বরকত হবে।

আমি এখন যত সেসব দিনগুলোর কথা ভাবি, আমার বিষ্ময় বাড়তেই থাকে মা। দু’টো মানুষ কতটা বিশ্বাসী হলে তোমাদের মত হতে পারে? কতটা মানুষকে আপন করে নিলে নিজে গরীব হয়েও অন্য আরেক গরীবের জন্য নিজের পরণের কাপড়টা পর্যন্ত দিয়ে দিতে পারে? আমি যে পারিনা মা। সেইসব দিনগুলো আর এখনকার সময়ের মাঝখানে পড়ে আমি তাই চিড়ে-চ্যাপ্টা হতে থাকি। আমার মন খারাপ হতে থাকে। আর ভাবতে থাকি, তোমরা যদি অমন না হতে আজকে তাহলে এমন দোটানায় ভুগতে হতোনা। আমরাও আর দশটা মানুষের মত ঈদে কয়টা কাপড় পেয়েছি সে হিসাব করতে পারতাম। কার কাপড়ের চেয়ে কারটা বেশী দামী হলো, কার চেয়ে কাকে বেশী সুন্দর লাগলো সে আলোচনায় অংশ নিতে পারতাম। কিন্তু তারপরেই আবার মনে হয়, ভাগ্যিস তোমরা অমন ছিলে। নাহলে যে আমরা মানুষ না হয়ে ড্রাকুলা-মানব হতাম; সব খেয়ে ফেলেও যার পেট ভরেনা। ভাগ্যিস, তোমরা অমন ছিলে! আর যাই হই, এই ভোগবাদী সমাজের ড্রাকুলা-মানব হতে চাইনা।

2 comments:

  1. আপনার মতো আমাদেরও 1মনে আছে আমরা দুই ঈদে কেবল এক জোড়া কাপড় পেতাম। তার তুলনায় আজকাল যেভাবে কেনাকাটা হয় তা আসলেই অস্বাভাবিক। এবারের ঈদের বাজারে গিয়ে আমি নিজে কিছু কিনতে পারিনি দাম শুনে। প্রতিবার দাম শুনি আর ভাবি দেশের মানুষ বলে গরীব তাহলে কি করে কিনছে? এমন তো নয় অতো দাম রাখার পরও বিক্রি হচ্ছে না?

    তিন বছর পর এবার একটা জুতো কিনলাম, দাম শুনে মনে হলো এক কালে আমরা ১০০-২০০ টাকা দিয়ে জুতা কিনতে গেলেই আঁতকে উঠতাম এখন ১৪০০ টাকা দিয়ে সাধারণ জুতাও পাওয়া যায় না।

    এমন নয় আমার বয়স খুব বেশি, নিজের জীবন এখনও শুরুই করিনি বলতে গেলে তারপরও অবাক লাগে দেশের অবস্থা দেখে মানুষের অবস্থা দেখে।
    আমার বন্ধুবান্ধবদের বলি, ভালোবাসার মানুষকে বলি, তারা শুনে আর হাসে। বলে এটাই বাস্তবতা এটাকেই মেনে নিতে হবে। মনের বিরুদ্ধে মানিয়ে নেবার লড়াই চালিয়ে যেতে থাকি............

    ReplyDelete

এ যাবত সর্বোচ্চ পঠিত লেখা-

ছড়া-কবিতা নিয়ে কিছু কথা...

এই ব্লগে "ছোটদের জন্য সংগৃহীত ছড়া/কবিতা" লেবেলে যে ছড়া-কবিতাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে (হচ্ছে) তা আমার ছোটভাই ফুয়াদ আমিনের নামে উৎসর্গ করা হলো; যে আমাকে ছড়া বলতে শিখিয়েছিল। যাকে ছড়া শোনাতে শোনাতে নিজেই একসময় ঘুমিয়ে যেতাম! কারেন্ট চলে গেলে আম্মুর রুমে খাটের পাশের জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় যে 'আয় আয় চাঁদ মামা' শুনতে শুনতে চাঁদের দিকে আংগুল তুলে অবাক চোখেমুখে বলতো 'তাদ! তাদ!' চাঁদের বুড়ির চরকি কাটার গল্প শোনা ফুয়াদ অবশেষে একদিন নিজেই কেমন করে যেন চাঁদের দেশে চলে গেলো... ফুয়াদ চলে গেলেও আজকের এবং আগামীর সব শিশুরা চাঁদ, আকাশ, ফুল, পাখি আর ছড়ার মেলায় হুড়াহুড়ি করে বেড়ে উঠুক, এটাই প্রত্যাশা...

ছড়া-কবিতার সংগ্রহে বিশেষ কৃতজ্ঞতায়- তারিক রিদওয়ান, বিবেক, সোহায়লা, জিপসী, তরংগ এম ইসলাম, ভাষ্কর চৌধুরী, তুষার কন্যা, তাহসিনা সাঈদা মুন আপু, সাদিয়া হোসাইন, নাজনীন সুলতানা, মামুন এম আযিয, ওস্তাদের ওস্তাদ, মঈন উদ্দীন জাহিদ, নাজলা আপু, ভবঘুরে ঝড়, আলোর ছটা, রেহনুমা ম্যাডাম, আব্দুল্লাহ মাহমুদ নাজিব, Zareen Firdegar.

অনুরোধঃ ছড়াগুলোতে বানান ভুলের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। ছড়াকারদের নাম পাওয়া যায়নি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। যাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা হয়েছে মূলতঃ তাদের স্মৃতি থেকেই যতটুকু যেভাবে পাওয়া গিয়েছে সেভাবেই এখানে তুলে দেয়া হয়েছে। ভুল বানান চোখে পড়লে, অথবা কোনোটির ছড়াকারের নাম জানা থাকলে কমেন্ট আকারে জানাতে পারেন। অথবা নতুন কোনো ছড়া এই সংগ্রহে দিতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন- jajaborrr@হটমেইলডটকম