17 April, 2011

নাম নিয়ে উপাখ্যান!


‘কীরে তুই বলে এখন থেকেই নাম নিয়ে ঝামেলা পাকাইতেছস?’ অবাক হয়ে বললাম, ‘ঝামেলা কখন পাকাইলাম? বাচ্চার একটা ভালো নাম রাখতে হবেনা? এইজন্য একটা ভালো নাম খুঁজতেছি’।  সাথে সাথে উলটা ঝামটা, ‘বাচ্চা আসবে সেই কোন জুলাই অগাষ্টে, আর তুই এখনি নামের পিছনে দৌঁড়াইতেছস?!’ আমি আরো অবাক হয়ে বললাম ‘জুলাই অগাষ্টে আসবে মানে কি?? বাচ্চা তো দুনিয়াতে এসেই গেছে, পার্থক্য একটাই সে এখনো আমার পেটের ভিতরের প্রটেকশানে আছে। পেটের ভিতরে হোক বা বাইরে, সেতো এই দুনিয়াতেই আছে!!’ কথাবার্তা আরো অনেকদূর গিয়েছিলো এবং যথারীতি বান্ধবী রাগে গরররররর করতে করতে যা বললো তা হলো বাচ্চা পেটের ভিতর থেকে পেটের বাইরে আসার আগ পর্যন্ত মানুষকে যতটা সম্ভব ‘এই বিষয়’-এ ‘জানাজানি’ না করানো ভালো।

এই সংস্কার নতুন কিছু না। একটা মেয়ে তার জীবনের সবচে’ ভলনারেবল, সবচে’ কষ্টকর সময়ের ভিতর দিয়ে যাবে এবং সে এ বিষয়ে কথা বলবেনা, ঢাক ঢাক গূঢ় গূঢ় করে রাখবে, আমাদের সমাজে এর চে আরো কত হাজার হাজার অন্যায় চাহিদার ভিতর দিয়ে যে মানুষজন জীবন অতিবাহিত করে, তাতো আর নতুন কিছুনা। তাই বান্ধবীকে কুল ডাউন করতে বললাম ‘দোস্ত, ঠিকাছে। তুই এত চিন্তা না করে আমার মেয়ের জন্য একটা ভালো নাম দেখ’। বান্ধবীর কথাকে পাত্তা দেই নাই বুঝতে পেরে বান্ধবী সর্পনাগীনির মত ফুঁসতে ফুঁসতে ফোনটাই রেখে দিলো!


যাক, বান্ধবী পর্ব বাদ দিয়ে নাম নিয়ে উপাখ্যানে ফেরত আসি। মানুষের নামের প্রতি আমার এক ধরনের কেমন যেনো আগ্রহ আছে। অনেক আগে থেকেই কারো নাম শুনলে সে নামের যদি অর্থ না জানি তাহলে প্রথমেই উক্ত নাম-ওয়ালা/ওয়ালী’কে তার নামের অর্থ জিজ্ঞেস করা আমার স্বভাব। দেখা গেছে কারো দূর সম্পর্কের কোনো পরিচিত’র সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললো ‘ওর নাম অমুক’। ভদ্র-মানুষটার সাথে আমার প্রথম দেখা, প্রথম কথা, শুরুতেই সালাম দিয়েই দেখা যায় প্রশ্ন করে বসেছি ‘আপনার নামের অর্থ কী?’ একবার তো একজন কেমন যেন মাইন্ড করেই বসেছিলো। উলটা জিজ্ঞেস করেছিলো ‘আমার নামের অর্থ দিয়ে আপনি কী করবেন?’ আমি যেনো তার মাইন্ড করা বুঝতেই পারিনি এমনভাবে বলেছিলাম ‘কিছু করবোনা। আমার নামের অর্থ জানার খুব আগ্রহ’।

প্রথম বাচ্চা, নতুন মা হতে যাচ্ছি ইনশাআল্লাহ, তাই যাবতীয় কষ্টের পাশাপাশি কিছু কিছু বিষয় নিয়ে অহেতুক উত্তেজিত হয়ে আছি। তারমধ্যে অন্যতম একটা বিষয় হলো ‘নাম’। খুব সম্ভব কোনো একটা হাদীসে পড়েছিলাম- আমি ঠিক শিউর না হাদীসেই পড়েছিলাম কিনা- যে, বাবামা’র উপর সন্তানের অন্যতম একটা অধিকার হলো বাবামা তার সন্তানের ভালো একটা নাম রাখবে। আব্বুকে দেখেছি আমাদের ভাইবোনদের নামের ব্যাপারে খুব কনসার্ন ছিলেন। ছোটবেলায়, ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত আমার নামের শেষে ‘জাবীন’ ছিলো। কিন্তু কীভাবে যেনো আব্বু জানলেন ‘জাবীন’ নামটা ঠিক মুসলিম নাম না, ব্যাস বাসায় এসে মিটিং বসলো। আমার নামের সাথে মিল রেখে আমার ছোট বোনের নামের শেষে ছিলো ‘জাররীন’। কিন্তু আব্বু সুন্দর করে ব্যাখ্যা করলেন জাবীন নামটা কেনো চেইঞ্জ করতে চান। আমিও রাজী, সবাই রাজী। ব্যাস, আমার নাম চেইঞ্জ। যেহেতু আমারটার সাথে আমার বোনেরটার মিল রাখতে হবে, অতএব আমার বোনেরটাও চেইঞ্জ! তবে আব্বুর প্রতি আমার অন্যতম কৃতজ্ঞতা হলো আব্বু আমাদের সব ভাইবোনদের নাম রেখেছেন প্রচন্ড অর্থবোধক এবং বেশ সুন্দর।

আমাদের সমাজে বাচ্চাকাচ্চার মুসলিম নাম রাখার প্রবণতা আছে। বিশেষ করে অনেক বাবামা’ই চান কোর’আন শারীফ থেকে সুন্দর একটা নাম রাখবেন। কিন্তু যেহেতু বেশীরভাগ মানুষই আরবী ভাষা বুঝেন না এবং এর অর্থ জানেন না, তাই কোর’আন শারীফ থেকে আরবী নাম রাখতে গিয়ে কত ঘটন-অঘটনই না ঘটে! একবার একজায়গায় শুনেছিলাম বাচ্চার দাদী কোরা’আন থেকে নাতির আনকমন(!) নাম রাখতে গিয়ে সূরা আন’আম থেকে শব্দ বেছে নিয়ে নাম রেখেছেন ‘খিনজির’! পরে যখন আকীকার দিন জানাজানি হলো ‘খিনজির’ শব্দের অর্থ শূকর, তাড়াতাড়ি নাম বদলে আরেকটা নাম রাখা হলো। আরেকবার এক বাসায় গিয়ে দেখেছিলাম বাচ্চার নাম ‘মাঈদা’। শব্দটা যে আরবী শব্দ হতে পারে, মাথাতেই ছিলোনা, যথারীতি নিজের আগ্রহ থেকেই জিজ্ঞেস করলাম নামের অর্থ কী। আন্টি খুব আগ্রহ নিয়েই বললেন কোর’আন শারীফ থেকে বাচ্চার নাম খুঁজতে গিয়ে উনি একদিন সূরা মায়িদা পড়তে গিয়ে মায়িদা শব্দটা খুব পছন্দ হয়ে যায়। শব্দটা নাম হিসেবে আনকমনও! তাই বাচ্চার নাম ‘মাঈদা’! টাশকি খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম ‘আন্টি, কাউকে নামটার অর্থ জিজ্ঞেস করেছিলেন?’। উনি অবাক হয়ে উত্তর দিলেন ‘কোর’আন শারীফ’র শব্দ। নিশ্চয়ই ভালো কোনো অর্থই হবে’।  এই ব্যাখ্যা শুনে আমি আর নিজ থেকে উনাকে বলিনি যে মায়িদাহ শব্দের অর্থ টেবিল!! উনার বাচ্চার নামের অর্থ টেবিল!  

আয়িশার সাথে নাম নিয়ে আলাপ করতে গিয়ে সে আরেক কাহিনী শুনালো। এক ভদ্রলোক কোর’আন থেকে বাচ্চার নাম রাখতে গিয়ে সূরা মু’মিনূন থেকে শব্দ বেছে নিয়ে নাম রেখেছিলেন ‘তুকাযযিবুন’! এই শব্দের মূল রুটস হচ্ছে আরবী কাফ-যাল-বা, যার অর্থ মিথ্যা বলা, অস্বীকার করা!!! শুধু কী কোর’আন থেকে নাম, আরবী নাম রাখতে গিয়েও তো কম বিপত্তি ঘটান না অনেকে। বাংলাদেশে বহুল প্রচলিত একটা আরবী নাম হলো মাহা, যার অন্যতম অর্থ ‘বন্য গরু’!  অনেকেই আবার সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখেন ঠিকই, কিন্তু নামের মধ্যে আরবী ক্বলক্বলার এলফেবেট আ’ইন, ক্বা’ফ, হা’ ইত্যাদি থাকায় এবং এই শব্দগুলো যথাযথভাবে উচ্চারণ না করায় নামের অর্থ বিকৃত হয়ে যায় খুব সহজেই।  খাদিজা, আ’য়িশা, মারইয়াম, ফাতিমা, রাহি’মা খুব সুন্দর সুন্দর নাম, উচ্চারণ ঠিকমত করতে পারলে খুব সুন্দর শোনায়, কিন্তু এই নামগুলোই আমাদের সমাজে এসে হয়ে যায় খোদেজা, মরিয়ম, আয়শা, ফাতেমা, রহিমা!

অনেকেই আবার নাম রাখার ক্ষেত্রে কোনো চিন্তাভাবনাই করেন না। এক ছেলের নাম শুনেছিলাম ‘আদর’! অবাক হয়ে চিন্তা করেছিলাম এত বড় ধামড়া ছেলের নাম আদর কেনো?? এই ছেলের যখন বাচ্চাকাচ্চা হবে তখন বাচ্চাগুলো কীভাবে স্কুলে বা বন্ধু-বান্ধবীদেরকে বলবে ‘আমার বাবার নাম আদর’?!

এইসব কিছু চিন্তা করতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়েছি আমি। জিপসীর স্পেশাল পছন্দ কোনো নাম নেই। আমিও আগে নাম নিয়ে কিছু ভাবিনি। এখন নাম খুঁজতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই চাই এমন একটা নাম রাখতে যা নিয়ে উচ্চারণে কারো কোনো সমস্যা হবেনা, আবার নামের অর্থের ক্ষেত্রে আমার দূর্বলতা আছে ‘ইন্টেলিজেন্ট’ অর্থের প্রতি। আমি খুব শক্তভাবে বিশ্বাস করি মানুষের জীবনে তার নামের বেশ ভালো রকম প্রভাব থাকে। কিন্তু এখন স্পেসিফিক এই রিকয়ারমেন্টে নাম খুঁজতে গিয়ে হয়েছে বিপদ, নামই খুঁজে পাইনা!  শব্দ সুন্দর তো অর্থে সমস্যা, আবার অর্থ সুন্দর তো উচ্চারণ কঠিন, আবার অনেকে এমন অনেক নাম প্রস্তাব করেন যার অর্থই সব আজব আজব! একজন খুব সুন্দর একটা শব্দ বললেন, উচ্চারণও সোজা, কিন্তু তার অর্থ ‘তরল’। এখন কেউ কেনো তার বাচ্চার নাম ‘তরল’ রাখবে?! বাচ্চার ক্যারেক্টার তরল পদার্থের মত হওয়ার জন্য? নাকি বাচ্চাটা তরল পানির মত হোক?!

এই হলো নাম নিয়ে উপাখ্যান, যে উপাখ্যান এখনো ‘চলিতেছে’!

5 comments:

  1. নাম নিয়ে আমারও কম বেশী ইন্টারেস্ট আছে... তবে আমি সহজ সরল পদ্ধতি অবলম্বন করি..
    যেমন আপনার মেয়ের জন্য নাম প্রস্তাব করতে বললে আমি এত কষ্ট না করে সেরা নাম থেকে যে কোন একটা বেছে নিব.. যেমন "ফাতিমা" :) যেটা নামেও মহৎ, উচ্চারনেও সহজ এবং আপনার নামের সাথেও একটা মিল খুঁজে পাওয়া যাবে... :)

    ReplyDelete
  2. যেখানে পানি বহে, সেই স্থানের নামগুলো মানুষের বেশ পছন্দের, এ জন্যই মানুষ নিজের সন্তানের নাম রাখে "সাগর", "সৈকত", "নদী", "ঝর্ণা",..... একদিন দেখা যাবে নাম রাখবে "পুকুর", "নদী-নালা", "খাল-বিল", "ড্রেন-নর্দমা", "সোয়ারেজ লাইন",

    ReplyDelete
  3. apnar namer shathe mil rekhe 'Farha Maryam' rakhte paren. farha shobder ortho 'anonde poripurno'. ekjon ma hishebe meyeta ke shara jibon shukhi dekhte ke na chai, bodh kori ekta meyer jonne etai shob chaite araddho bostu ebong durlov o bote. ar maryam namta ei shomoye khub e prashongik ebong significant. keno she ta to apni e bhalo janen. tachara ekta rhythm o ache ete...

    namta ki rakhlen, janaben kintu. amar mail address ta dichchi na...ami apnar fb friend der ekjon. apni jodi doya kore fb te update den, taholei jene jabo. apnar o apnader meyetar jonno onek dua.

    ReplyDelete
  4. আচ্ছা আপু, আপনি কি সচলায়তনের যাযাবর ব্যাকপ্যাকার? আপনার ব্লগে মাঝে মাঝেই আসি, কিন্তু চিনতে পারছিনা।

    ReplyDelete
  5. কমেন্টের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। 'ফাতিমা' নামের সমস্যা হলো এরাবিক ত্বোয়া'র উচ্চারণ কেউ করতে পারেনা, ত্বোয়া'র বদলে তা'র উচ্চারণ করে। আর ফারহা নামের সমস্যা হলো এরাবিক বড় হা' গলার ভিতর থেকে উচ্চারিত হয়, এটাও কেউ উচ্চারণ করতে পারেনা।

    নীল রোদ্দুর, জ্বী না, আমি সচলাতয়নে লিখিনা। :)

    ReplyDelete

এ যাবত সর্বোচ্চ পঠিত লেখা-

ছড়া-কবিতা নিয়ে কিছু কথা...

এই ব্লগে "ছোটদের জন্য সংগৃহীত ছড়া/কবিতা" লেবেলে যে ছড়া-কবিতাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে (হচ্ছে) তা আমার ছোটভাই ফুয়াদ আমিনের নামে উৎসর্গ করা হলো; যে আমাকে ছড়া বলতে শিখিয়েছিল। যাকে ছড়া শোনাতে শোনাতে নিজেই একসময় ঘুমিয়ে যেতাম! কারেন্ট চলে গেলে আম্মুর রুমে খাটের পাশের জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় যে 'আয় আয় চাঁদ মামা' শুনতে শুনতে চাঁদের দিকে আংগুল তুলে অবাক চোখেমুখে বলতো 'তাদ! তাদ!' চাঁদের বুড়ির চরকি কাটার গল্প শোনা ফুয়াদ অবশেষে একদিন নিজেই কেমন করে যেন চাঁদের দেশে চলে গেলো... ফুয়াদ চলে গেলেও আজকের এবং আগামীর সব শিশুরা চাঁদ, আকাশ, ফুল, পাখি আর ছড়ার মেলায় হুড়াহুড়ি করে বেড়ে উঠুক, এটাই প্রত্যাশা...

ছড়া-কবিতার সংগ্রহে বিশেষ কৃতজ্ঞতায়- তারিক রিদওয়ান, বিবেক, সোহায়লা, জিপসী, তরংগ এম ইসলাম, ভাষ্কর চৌধুরী, তুষার কন্যা, তাহসিনা সাঈদা মুন আপু, সাদিয়া হোসাইন, নাজনীন সুলতানা, মামুন এম আযিয, ওস্তাদের ওস্তাদ, মঈন উদ্দীন জাহিদ, নাজলা আপু, ভবঘুরে ঝড়, আলোর ছটা, রেহনুমা ম্যাডাম, আব্দুল্লাহ মাহমুদ নাজিব, Zareen Firdegar.

অনুরোধঃ ছড়াগুলোতে বানান ভুলের সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে। ছড়াকারদের নাম পাওয়া যায়নি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই। যাদের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা হয়েছে মূলতঃ তাদের স্মৃতি থেকেই যতটুকু যেভাবে পাওয়া গিয়েছে সেভাবেই এখানে তুলে দেয়া হয়েছে। ভুল বানান চোখে পড়লে, অথবা কোনোটির ছড়াকারের নাম জানা থাকলে কমেন্ট আকারে জানাতে পারেন। অথবা নতুন কোনো ছড়া এই সংগ্রহে দিতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন- jajaborrr@হটমেইলডটকম