(ডিসক্লেইমারঃ ওবামা, ওসামা, গাদ্দাফী, হাবি জাবি যারাই আছে, এদের কারো প্রতিই আমার কোনো অনুভূতি/সহানুভূতি/রাগানুভূতি কিছু নেই। এরা সবাই আমার মতে একই পয়সার এপিঠ, ওপিঠ। সবাই খেলারাম খেলে যা'র খেলোয়ার মাত্র।)
স্টেশান থেকে বাসায় আসার কয়েক মিনিটের রাস্তা হেলেদুলে মোটামোটি আধাঘন্টা সময় লাগিয়ে যখন কাজ থেকে বাসায় ফিরছি, জিপসী ফোন করে বললো ‘তোমার জন্য একটা খুশীর খবর আছে’। ভ্রু কুঁচকে গেলো অটোমেটিক। গলার আর নাকের ভিতরের কফের সমস্যাটা ঠিক হয়ে যাওয়া এবং পেট ভরে খেতে পারার বাইরে দুনিয়াতে আর কোনো খবরই আমার কাছে সুখবর হওয়ার কথা না, জিপসী ভাল করেই জানে। নিরাসক্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম ‘কী খবর?’ জিপসী বোম ফাটালো ‘ওসামা বিন লাদেনকে এমেরিকা একটু আগে কমান্ডো আক্রমন করে পাকিস্তানের ভিতরে খুন করেছে’। নিজের রিএকশানে নিজেই অবাক হলাম, কেমন যেনো আসলেই খুশী লাগছে। এই একটা নাম, এই একটা সিম্বল পুরা দুনিয়ার সোশাল-পলিটিক্যাল-সাইকোলজিকাল স্ট্রাটেজী চেইঞ্জ করে দিয়েছে গত দশ বছরে। লক্ষ্য লক্ষ্য না, বরং কোটি কোটি মানুষ সাফার করছে এই একটা নামের সিম্বলিক ইউজ/মিসইউজের কারণে। এই নামটার পতনের কেমন যেনো দরকার ছিলো।
তাৎক্ষণিক রিএকশান কাটিয়ে আবার হেলেদুলে আস্তেধীরে বাসায় এসে নিউজ কাভারেজ শুনতে শুনতে আস্তে আস্তে কতগুলো প্রশ্ন জাগলো মনে। আগে-পিছে কোনো ধরনের অনুঘটকের উপস্থিতি ব্যতিরেকেই ধুম করে ঘটনাটা ঘটলো, কারণ কী? ওবামা’র নির্বাচনের সময় কাছাচ্ছে বলে নাকি? ওরা নাকি জানুয়ারী থেকে এই জায়গাটা লোকেট করেছে, জানুয়ারী থেকে মে’র শুরু, বিন লাদেনের মত ‘তথাকথিত’ ওয়ার্ল্ডের নাম্বার ওয়ান ওয়ান্টেডকে হাতের কাছে পেয়েও ওরা চারমাস ধরে রিস্ক নিয়ে কীসের জন্য অপেক্ষা করছিলো? সবাই দেখি একটাই এক্সক্যুজ দেখাচ্ছে চারমাস ওয়েট করার পিছনে- ‘পাকিস্তানের মত “প্রিমিটিভ” দেশে টেকনলজি কাজ করেনা। ওখানে ওরা হিউম্যান ইন্টেলিজেন্টস’র অভাবে এতদিন অপারেশানটাতে হাত দিতে পারেনি’। আমি হিহি করে হেসে ফেললাম কথাটা শুনে। ছোটবাচ্চাকে লেবেঞ্চুস দিয়ে ভুলানোর চেষ্টা যেনো। এমেরিকা আর তার এলায়েন্সদের টেকনোলজি- সে টেকনোলজি টেকনিকাল হোক বা হিউম্যান রিসোর্স হোক- পৃথিবীর প্রতিটা ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গা যেখানে কাভার করে, সেখানে এই ধরনের অজুহাত যে কতটা হাস্যকর! পাকিস্তানে সময়ে ওদের টেকনলজি কাজ করেনা, আবার সময়ে ঠিকই একটা 'সার্বভৌম' 'স্বাধীন' (!!) দেশের ভিতরে গিয়ে এমেরিকার কমান্ডোরা অনায়াসে আকাংখিত ব্যক্তিকে খুন করে তুলে নিয়ে আসতে পারে!
বিন লাদেন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে এবং পাকিস্তান মিলিটারী বেইসের সাথে বলতে গেলে গায়ে গা লাগানো একটা বি-শা-ল কমপার্টমেন্টে এতদিন বসবাস করছিলো। পাকিস্তান নিয়ে আমার পড়ালেখা এবং অভিজ্ঞতা বলে পাকিস্তানী আইএসআই অবশ্যই জানতো বিন-লাদেন এখানেই আছে। এবং শুধু জানতো না, বরং বিন-লাদেনকে পাকিস্তানে আশ্রয় দেয়ার ক্ষমতা এবং সামর্থ্য একমাত্র আইএসআই’র-ই আছে। যারা এদেরকে নিয়ে পড়ালেখা করে এবং ফিল্ড অভিজ্ঞতা আছে তাদের কাছে এটা মোটেও গোপনীয় না যে এমনকি পাকিস্তানের সরকার পর্যন্ত আইএসআইকে সকাল বিকাল দুইবেলা সালাম দিয়ে চলে। আইএসআই অনেকটা সিআইএ’র মত স্বতন্ত্র বডি, যার সেন্ট্রাল কমান্ড সরকারের হাতে নামেমাত্র, লোক দেখানোর জন্য। মজার কথা হলো ‘মুসলিম-বিশ্ব-বিশেষজ্ঞ’ সাংবাদিক রবার্ট ফিষ্কও একটা কথা বললো ‘সামথিং হ্যাপেন্ড ইনসাইড’। কথাটা আমার বেশ মনে ধরেছে। আসলেই ভিতরে কিছু একটা হয়েছে, যার কারণে দশ বছর যাকে শেল্টার দিয়ে রেখেছে, তাকেই ‘যথাসময়ে’ এমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছে আইএসআই। অবশ্যই ‘সামথিং হ্যাপেন্ড ইনসাইড’।
আমরা হলাম দুনিয়ার সাধারণ মানুষ, মিডিয়া আর পলিটিশিয়ানরা আমাদেরকে ইংলিশ ছয়কে যখন উলটা করে ধরে বলে ‘দেখো এটা নয়’, আমরাও বুজুর্গের মত মাথা নেড়ে ভাবি, ঠিক, এটা তো নয়’র মতই লাগছে! কেউ আর নয়কে উলটা করে ধরে চিন্তা করিনা, আরে এটা তো ছয়-ও হতে পারে! কোথায় যেনো পড়েছিলাম, কেউ একজন বলেছিলেন ‘নিজের চোখকেও বিশ্বাস করবানা, কারণ চোখ দিয়ে যা দেখছো তা শুধু দৃশ্যমান বিষয়গুলো দেখছো, একটা ঘটনার পিছনে অদৃশ্য অনেক ঘটনা থাকে, যেগুলো জানা/বুঝা ছাড়া শুধুমাত্র সামনের ঘটনা দেখে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া বোকামী’। যত দিন যাচ্ছে কথাটা তত সত্য থেকে সত্যতর হচ্ছে। মিডিয়া কভারেজের সামনে বসলে তাই নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগে। মনে হয় কেমন যেনো ছোট বাচ্চাদের মত আমরা সবাই হা করে আছি, আর পৃথিবীর খেলনেওয়ালারা আমাদের হা করা মুখের ভিতর চামচ করে করে খাবার দিচ্ছে, আর আমরা কোৎ কোৎ করে গিলে খাচ্ছি! বাচ্চাদের মত একবার চিন্তাও করে দেখিনা আসলে কী খাচ্ছি!! ছোট বাচ্চাদের হাতে ঝুনঝুনি দিয়ে যখন বলে ‘নাচো নাচো’ আর বাচ্চা ঝুনঝুনি’র শব্দে আনন্দে দুলে, আমরাও সবাই একটা একটা ঝুনঝুনি’র জন্য বসে থাকি, হাতে ঝুনঝুনি পেলেই সবাই নাচতে থাকি!
বিশ্ব হর্তাকর্তাদের বক্তব্যগুলো খুব মনযোগ দিয়েই শুনলাম। টনি ব্লেয়ার একটা কথা বললো ‘বিন লাদেন মরেছে ঠিকই, কিন্তু বিন লাদেন ওয়েষ্ট এবং ইসলামের বেসিক পার্থক্যের যে দৃষ্টিভংগী ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে পৃথিবীতে, সেটা মরেনি। আমাদের যুদ্ধ সেই দৃষ্টিভংগীর বিরুদ্ধে’। বড়ভাইয়া চা খেতে খেতে একটা কমেন্ট করলো, ‘এই দৃষ্টিভংগী কী বিন লাদেন দিছিলো নাকি?? এইটা তো স্যামুয়েল হান্টিংটনদের দল-বল অনেক আগেই স্টাবলিশড করে গেছে। বিন-লাদেন হচ্ছে সেই তত্ত্বের একটা রিএকশনারী ট্রেন্ড মাত্র’। কথাটা ভাবার মত। ভাবতে ভাবতেই ভাবলাম, এই তত্ত্ব যখন হান্টিংটনরা দেয় তখন টনি ব্লেয়ারদের কাছে তারা হয়ে যায় ওয়ার্ল্ড-ফেমাস দার্শনিক, আর এই তত্ত্ব যখন বিন-লাদেনরা দেয় তখন তারা হয়ে যায় ওয়ার্ল্ড-মোষ্ট-ওয়ান্টেড-টেররিষ্ট, একেই বলে আয়রনি!
আরেকটা জিনিষে খুব মজা পেলাম, এই ওয়ার্ল্ড-মোষ্ট-ওয়ান্টেড-টেররিষ্ট সাহেবকে এমেরিকা এবং তাদের এলায়েন্স এতই ভয় পায় যে খুন করার পরও লাশটাকে পর্যন্ত ভয়ের চোটে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে এসেছে!!! শুধু কী তাই? সকালের নিউজ কাভারেজে দেখি নতুন টপিক্স- বিন লাদেনের মত গাদ্দাফীকেও মেরে ফেলা হোক! উপস্থিত একজন হালকা পাতলা ‘হিউম্যান রাইটস’র কথা তুলে একটু প্রতিবাদ করতে চেষ্টা করলো, কিন্তু পাত্তাই পেলেন না। শুনে আমি তো পুরাই ওয়াও, অবশ্য ওয়াও হওয়ার কিছু নেই। গাদ্দাফী’কে সরাসরি মেরে ফেলার প্রচেষ্টাতো কম হচ্ছেনা। গত দুইদিন আগেই তো গাদ্দাফী প্রাণে বেঁচে গেলেও তার ছোট ছেলে তিন শিশু সন্তান সহ খুন হলো। হিটলারকে যেমন তৎকালীন এলায়েন্স ৪২ বার চেষ্টা করেও মারতে পারেনি, গাদ্দাফীর অবস্থাও অনেকটা সেরকম, কচ্ছপের প্রাণ, প্রতিবার প্রত্যেকটা এসাসিনেশান এটেম্পট থেকে সে কীভাবে যেনো প্রাণে বেঁচে যায়। সকালের নিউজ কাভারেজে এও শুনলাম যে ওবামা জর্দান, সিরিয়ার বিষয় নিয়েও গভীরভাবে ভাবছে!
তেনারা বিশ্বের হর্তা-কর্তা, কতকিছু ভাববেন তারা দুনিয়াদারী নিয়ে। আমরা সাধারণ মানুষ, তারপরও আমাদেরও মাঝে মাঝে একটু আধটু ভাবনা আসে। কিন্তু একটু পরেই আমাদের ভাবনাগুলোকে বিলাসিতা মনে হয়। কারণ আমরা ওবামাও না, ওসামাও না, হান্টিংটনও না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে যুদ্ধ করতে করতেই ক্লান্ত সৈনিক, যাদের ইউজ বা মিসইউজ করে ওবামা আর ওসামা’রা হারে আর জিতে।

আপনার সাথে একমত।
ReplyDeleteKotha shobi moner kOtha bolle. Kintu shob seshe Amra shadaron jonogon asholei ki korte pari?
ReplyDelete