ভদ্রলোকের সাথে প্রতি সপ্তায় একদিন হেঁটে হেঁটে ক্যাজুয়াল টীচার্স রুম থেকে লেকচার রুম পর্যন্ত যাওয়া হতো। উনার আর আমার লেকচার রুম একই বিল্ডিং’র একই ফ্লোরে হওয়ায় এবং দু’জনেরই ক্যাজুয়াল টীচার্স রুম একই অফিসে হওয়ায় এবং দু’জনেরই ক্লাস টাইমও একই সময়ে হওয়ায় টীচার্স রুম থেকে লেকচার রুম পর্যন্ত দশ মিনিটের হাঁটাটা দু’জনের একই সাথে পড়তো। কত কথা যে বলতাম উনার সাথে! বিশ্ব রাজনীতি, অস্ট্রেলিয়ান কালচার, স্টুডেন্টদের কান্ডকারখানা, দু’জনের পরিবার, আমার অনাগত সন্তান, উনার মেয়েরা, মেয়েদের নাম রাখার কাহিনী, মেয়েদেরকে দার্শনিক বানানোর স্বপ্ন!
ইনফ্যাক্ট জীবনে মনে হয় এই একটা মানুষই দেখেছি যে কিনা নিজের দুই মেয়েকেই ফিলোসফার্স বানাতে চায়! উনার প্যাশান সুফীবাদ, আমার প্যাশান গ্রাস-রুটস-লেভেল-মানুষ। উনার সুফীবাদ নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়েই জেনেছিলাম উনি অলরেডী রিলিজন এন্ড মিস্টিসিজম এর উপর পিএইচডি করে বসে আছেন! আমরা জীবনে যত মানুষের সাথে মিলিমিশি সবার থেকে জানতে-অজানতে অনেককিছু শিখি। ভদ্রলোক থেকে শিখেছি প্রশ্ন করা, অন্যের মতামত জানার আগ্রহ, যা কিনা আল্টিমেটলি নিজের মতামতকেই সমৃদ্ধ করে।
আজকে ঐ ক্যাম্পাসে লাষ্ট ক্লাস ছিলো। স্টুডেন্টদের ফিডব্যাকগুলো পড়তে পড়তে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিলো বুকের ভিতর। ক’দিন আগে মাসুদের মৃত্যু এম্নিতেই কেমন যেনো চিন্তা-ভাবনাকে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে, অস্থির করে দিয়ে গেছে। ক্লাস ফাইভে একসাথে পড়ালেখা করা দুইজনের মধ্যে আমি ক্যাজুয়াল টীচারে এসে আটকে বসে আছি, আর মাসুদ এই অল্প বয়সেই ইউনিতে লেকচারার হয়ে গিয়েছিলো। একমাস হলো পিএইচডি করতে এসেছে। কীভাবে বিনা নোটিশে মরে গেলো ছেলেটা। পিএইচডি থেকে ছয়মাসের ছুটি নিচ্ছি। ছুটির এপ্লিকেশান পূরণ করতে করতে, শেষ ক্লাসে স্টুডেন্টদের ফিডব্যাক পড়তে পড়তে, নিজের দুইমেয়েকেই ভবিষ্যতে দার্শনিক বানানোর স্বপ্ন দেখা ভদ্রলোকের সাথে শেষবারের মত হাঁটতে হাঁটতে বুকের ভিতর কেমন যেনো গুড় গুড় একটা অনুভূতি টের পাই। মাত্র ছয়মাসের ছুটির জন্য কত প্রস্তুতি, কত ফরমালিটিজ; কিন্তু মাসুদ যে পুরা জীবন থেকে হঠাৎ করে পার্মানেন্ট ছুটি নিয়ে চলে গেলো!! বাবা-মা, বউ, ভাই-বোন, বন্ধু কাউকেই কিছু বলে যেতে পারলোনা। কেউই কী আসলে পারে?
প্রতিটা মৃত্যু আমাকে ফুয়াদের কথা মনে করিয়ে দেয়, যার মৃত্যুর পর কত দিন, ক-ত-দি-ন ওর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিশ্বাস করতে চেষ্টা করেছি যে ও আসলেই মরে গেছে। প্রতিটা মৃত্যু আমাকে সাতমাসের গর্ভবতী ফুপাতো বোনটার কথা মনে করিয়ে দেয়, যার ঠান্ডা হয়ে যাওয়া দেহের পেটে হাত দিয়ে অনেক্ষণ বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম পেটের বাচ্চাটাও মরে গেছে নাকি। প্রতিটা মৃত্যু আমাকে আইআইইউআই’র হলের বি ব্লকের উজমার কথা মনে করিয়ে দেয়। এম ফিলের থিসিস জমা দিয়ে যে মেয়েটা খুশীতে বান্ধবীদেরকে রান্না করে খাইয়ে আনন্দ করে হৈ হুল্লোড় করে ঘুমিয়েছিলো পরদিন বাড়ী যাবে বলে। ঘুমের মধ্যেই রাত তিনটার দিকে হঠাৎ করে মরে গেলো মেয়েটা! ... আরো কত জন!... এদের কেউই-ই প্রিপারেশান নিয়ে যায়নি, ধুম করে চলে গেছে বিনা-নোটিশে।
এই ভদ্রলোকের সাথে হাঁটা শেষ, তাই ওয়েবসাইট এড্রেস এক্সচেইঞ্জ, উনার দুই মেয়ের জন্য শুভকামনা, উনার সুফীবাদ নিয়ে হালকা ঠাট্টা, উনার জন্য শুভকামনা... এই স্টুডেন্টগুলোকে হয়তো আর কোনোদিন পাওয়া হবেনা, ওদের হাসি, ওদের সেমিষ্টার শেষের আনন্দ, আমার অনাগত সন্তানের জন্য ওদের শুভকামনা, নিজের টেইককেয়ার করার জন্য ওদের পাকামী করে উপদেশ, শেষবারের মত বোর্ড মুছতে মুছতে বুকের ভিতর গুড়গুড় অনুভূতিটা টের পাই। এই যে ছোট ছোট বিদায়, এই যে ছোট ছোট স্টেশান ফেলে জীবনের ট্রেনটার অবিরাম প্রতি সেকেন্ডে নিজের আল্টিমেট গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা... আমাদের জীবনেও আসলে ছোট ছোট অনেক মৃত্যু হয়। কিন্তু আমরা টের পাইনা। বা টের পেলেও বুঝতে চাইনা। মানুষের মন বড্ড অদ্ভুতুড়ে, তাই যা অনিবার্য তাকেই ভুলে থাকতে কত চায় অবিরাম। ... কিন্তু কাউকে বিদায় দিতে গিয়ে, কোথাও থেকে শেষবারের মত চলে আসতে গিয়ে, ভুলে থাকতে চাইলেও আসলে ভুলে থাকা যায়না। মনটা খারাপ হয়ে যায়। একলা একলা নিজেরই দীর্ঘশ্বাস পড়ে। জীবনটা, কোনো কারণ ছাড়াই বেঁচে থাকাটা, সবকিছু একটু বেশী সুন্দর লাগে, একটু বেশী আকর্ষনীয় লাগে। বার বার খালি মনে হয়, জীবনে শুধুমাত্র বেঁচে থাকাটাও কত বি-শা-ল একটা ব্যাপার!!

ভদ্রলোক থেকে শিখেছি প্রশ্ন করা- খুব ভাল জিনিস শিখেছেন। আমাদের দেশের সাংবাদিকদের যদি এই প্রশ্ন করার দক্ষতাটা থাকত, তয়াহএল দেশ অনেক আগেই অনেক বদলে যেত।
ReplyDeleteWe tried out best to send Masud's dead body to Bangladesh. But his family didn't want it to be cut. In less than one month, we found him pious, sincere and socail person.
ReplyDeleteMay Allah grant him Jannat.