কিছু কিছু জিনিষের প্রতি খুব শক্ত এক ধরনের মোহ আছে আমার। যেমন, উইন্ডশাইম, মানিপ্ল্যান্ট গাছ, ট্রেন... বাসা বললেই আমার কাছে মনে হয় ছোট একটা বারান্দা থাকবে। বারান্দায় যাওয়ার দরজায় উইন্ডশাইম ঝুলবে আর বারান্দায় থাকবে মানিপ্ল্যান্ট গাছ। মানিপ্ল্যান্টের পাতাগুলো বারান্দার গ্রীল বেয়ে বেয়ে উঠবে। যতই মোহগুলোকে একটু একটু করে ছাঁটাই করতে চাই, ততই কেমন যেন ঘুরে ফিরে ঠিকই আবার ফেরত আসে এরা।
ভাগ্যক্রমে এমন এক বাসায় এসে উঠেছি, যে বাসার পাশ দিয়েই ট্রেনের লাইন। প্রতি পাঁচ থেকে দশমিনিট অন্তর অন্তর ঝকর ঝক ঝকর ঝক করে ট্রেন যায়। কখনো কখনো যায় মালগাড়ি, একটানা যাচ্ছে তো যাচ্ছেই... আগে ট্রেন বললেই মাথার মধ্যে সাথে সাথে কেমন দূরে চলে যাওয়ার অনুভূতি খেলে যেতো। মনে হতো ট্রেন মানেই যেনো অপু আর দূর্গা হয়ে যাওয়া, ট্রেন মানেই যেনো ছেলেমানুষি করে ট্রেনের পাশে পাশে ট্রেনের সাথে পাল্লা দিয়ে ভোঁ দৌঁড়, যেনো যে কোনো কিছুর বিনিময়ে হোক ট্রেনের আগে যেতেই হবে... কিন্তু এখন যখন বাসার পাশ দিয়ে চব্বিশ ঘন্টা অনবরত একের পর এক ট্রেন যেতে থাকে, কারো সাথে ফোনে কথা বলার সময় বলতে হয় ‘ট্রেন যাচ্ছে, কিছুই শুনতে পাচ্ছিনা!’, টিভি দেখার সময় পজ দিয়ে রাখতে হয় যেহেতু কিছুই শোনা যায় না, তখন মনে হয় ধুর, এতো মহা ঝামেলা দেখি!
কিন্তু অনেকদিন পর আজকে হঠাৎ করেই কেনো যেনো ট্রেনের মোহটা শক্ত করে ফিরে এলো। ইচ্ছে হচ্ছিলো এখনি নেমে গিয়ে ট্রেনটাতে উঠে যাই। ট্রেনটা আমাকে নিয়ে যেতেই থাকুক, যেতেই থাকুক... অনন্তকাল যেনো আমরা চলতে থাকি। ট্রেনের জানালা দিয়ে একের পর এক দৃশ্য চলে যাবে, পাখিরা চলে যাবে, মেঘেরা চলে যাবে, আকাশ চলে যাবে, মানুষ চলে যাবে... সবকিছুর চলে যাওয়া দেখতে দেখতে বুকের ভিতর চিনচিনে একটা ব্যথা হবে, বার বার মনে হবে আহা সব চলে গেলো...
আমার মোহটা নিয়ে, ইচ্ছেটা নিয়ে একের পর এক ট্রেন যায়। চারতলার বারান্দা থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আর মেয়েকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরি। মেয়ের বুকের ভিতর ধুকপুক ধুকপুক হার্টবিটের শব্দ। অনেকটা কেমন যেনো ট্রেন যাওয়ার শব্দের মতই, একটা তালে, একটা রিদমে চলছে। আমি চোখ বন্ধ করে সেই ধুকপুক শুনি, মেয়ের গায়ের গন্ধে নাক ঘষি। কাতুকুতু লেগে মেয়ে খিল খিল করে হেসে উঠে। মেয়ের হাসি দেখে বুকে কেমন সেই চিনচিনে ব্যথাটা হয়, অদ্ভুত একরকম আনন্দ লাগে, ব্যথাও লাগে। সেই সব চলে যাওয়ার অনুভূতিটা হয়। মেয়ে খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে আমার দিকে তাকায়, চোখে আগ্রহ, আমি তার সাথে এখন কাতুকুতু খেলবো। আমি হাসতে চেষ্টা করি। মেয়েকে কাতুকুতু দেই, ও খিলখিলিয়ে হাসতেই থাকে।
আ জীবন!
আ জীবন!
ReplyDeleteআর কিছু বলতে পারলাম নাহ। সুন্দর। অনেকদিন পর লেখলেন মনে হয়?